দীর্ঘ শাটডাউনে যুক্তরাষ্ট্রে কঠিন হয়ে পড়বে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ

মার্কিন অর্থনীতির নীতিনির্ধারণে সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিক অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।

মার্কিন অর্থনীতির নীতিনির্ধারণে সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিক অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। এর মাঝে নতুন সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে চলমান শাটডাউন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে বিনিয়োগকারীরা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে জটিলতায় ভুগবেন। কারণ শাটডাউনের ফলে মার্কিন অর্থনীতির অভিমুখ বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবেন তারা। খবর এপি।

শাটডাউনে সৃষ্ট তথ্যসংক্রান্ত ঘাটতি যুক্তরাষ্ট্রে তাৎক্ষণিকভাবেই অনুভূত হচ্ছে। কারণ আজ মার্কিন কর্মসংস্থান প্রতিবেদন প্রকাশের কথা থাকলেও এটি বিলম্বিত হতে পারে। একই সঙ্গে সাপ্তাহিক বেকার ভাতা আবেদনের প্রতিবেদনও স্থগিত থাকতে পারে। সাধারণত ছাঁটাইয়ের সূচক হিসেবে ব্যবহার হয় বেকার ভাতা সংক্রান্ত পরিসংখ্যান।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের শাটডাউন স্বল্পমেয়াদি হলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটবে না। যদি কয়েক সপ্তাহ বা আরো বেশি সময় ডাটা প্রকাশ বন্ধ থাকে তবে সমস্যা জটিল হবে। বিশেষ করে মার্কিন আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

গত মাসে চলতি বছরে প্রথমবারের মতো সুদহার কর্তন করেছিল ফেড। সুদহারবিষয়ক পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য কিছু সূচকের ওপর নির্ভর করছে সংস্থাটি। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি এখনো ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপর রয়েছে। অন্যদিকে নিয়োগ প্রায় থমকে গেছে এবং আগস্টে বেকারত্বের হার বেড়েছে।

সাধারণত বেকারত্ব বাড়লে সুদহার কমায় ফেড। কিন্তু মূল্যস্ফীতি দ্রুত বাড়লে সুদহার বাড়ায় বা অন্তত অপরিবর্তিত রাখে। ২৮-২৯ অক্টোবর বসবে ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটির (এফওএমসি) পরবর্তী বৈঠক। এর আগেই যদি নতুন অর্থনৈতিক তথ্য পাওয়া না যায়, তবে সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হবে। বাজারে সুদহার কর্তনের প্রত্যাশা রয়েছে ব্যাপক, এমনকি শর্ত সাপেক্ষে ফেডও এমন ইঙ্গিত দিয়েছিল।

গবেষণা সংস্থা ওয়াশিংটন সেন্টার ফর ইকুইটেবল গ্রোথের সিনিয়র পলিসি ফেলো মাইকেল লিন্ডেন বলেন, ‘চাকরির বাজার এতদিন অর্থনীতির চালিকাশক্তি ছিল। কিন্তু গত কয়েক মাস তা বেশ মন্থর হয়ে গেছে। এ মন্থরতা অব্যাহত আছে, দ্রুততর হচ্ছে, নাকি উল্টো ঘুরছে—তা জানা খুবই জরুরি।’

গত মাসে ফেড কর্মকর্তারা বলেছিলেন, তারা মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের প্রবণতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। কিন্তু এর জন্য তথ্য পাওয়া জরুরি।

১৫ অক্টোবর মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদন প্রকাশের কথা। এর পরদিনই মাসিক খুচরা বিক্রির প্রতিবেদন আসার কথা রয়েছে। ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের সাম্প্রতিক মন্তব্য থেকেই প্রতিবেদনগুলোর গুরুত্ব বোঝা যাচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা এখন বৈঠক হিসেবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। তাই তথ্যের দিকেই তাকিয়ে আছি।’

মার্কিন অর্থনৈতিক চিত্র সম্প্রতি আগের তুলনায় জটিল হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে নিয়োগ ধীর হলেও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আবার বাড়তে পারে এমন লক্ষণ রয়েছে। ভোক্তারাও কেনাকাটা বাড়িয়েছে। আটলান্টা ফেডের পূর্বাভাস অনুসারে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পর তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশটিতে মার্কিন অর্থনীতি যথেষ্ট ভালো হারে সম্প্রসারণ হয়েছে।

ফেডের জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো চলমান প্রবৃদ্ধি কি চাকরির বাজারকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবে? এ বিষয়ে বোঝাপড়া কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে। ফ্যাক্টসেটের জরিপে অর্থনীতিবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন চাকরির পরিমাণ হবে মাত্র ৫০ হাজার। বেকারত্বের হার স্থির থাকবে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে, যা এখনো তুলনামূলকভাবে কম আশঙ্কাজনক।

সাধারণত প্রতি মাসের প্রথম শুক্রবার প্রকাশিত মাসিক কর্মসংস্থান প্রতিবেদন নিয়ে উৎসাহী থাকেন ওয়াল স্ট্রিটে বিনিয়োগকারীরা। কারণ এটি অর্থনৈতিক দৃঢ়তা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয় এবং ফেড কীভাবে সুদহার সমন্বয় করবে, তা বুঝতে সাহায্য করে। এর প্রভাব পড়ে ঋণ বাবদ খরচ ও বিনিয়োগকারীরা কোথায় অর্থ বরাদ্দ করবেন সে সিদ্ধান্তের ওপর। প্রতিবেদন অনুসারে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা মার্কিন শাটডাউনে বিচলিত নন। গত বুধবার এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক সামান্য বেড়ে সর্বকালের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে।

অনেক ব্যবসাও অর্থনীতির অবস্থা যাচাই করতে সরকারি ডাটার ওপর নির্ভর করে। মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাসিক খুচরা বিক্রির প্রতিবেদন যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে। এর ওপর ভিত্তি করে কোম্পানিগুলো সম্প্রসারণ বা সংকোচনের পরিকল্পনা নিয়ে থাকে।

এখনকার পরিস্থিতিতে ফেড, অর্থনীতিবিদ ও বিনিয়োগকারীরা বেসরকারি ডাটার ওপর নির্ভর করতে পারেন বলে মন্তব্য বিশ্লেষকদের। বেতন ও কর্মসংস্থান সম্পর্কিত বেসরকারি ডাটা পরিষেবা সংস্থা এডিপি গত বুধবার মাসিক কর্মসংস্থান তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ৩২ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে, যা অর্থনীতির মন্থরতার ইঙ্গিত দেয়। তবে এডিপির প্রধান অর্থনীতিবিদ নেলা রিচার্ডসন বলছেন, ‘আমাদের রিপোর্ট সরকারি পরিসংখ্যানের বিকল্প হিসেবে তৈরি করা হয়নি।’

এডিপির প্রতিবেদনে সরকারি সংস্থাগুলোর চাকরি অন্তর্ভুক্ত থাকে না। ওই খাতই দীর্ঘ শাটডাউনে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হতে পারে। নেলা রিচার্ডসন বলেন, ‘সরকারি ও বেসরকারি তথ্য মিলিয়ে দেখা জটিল অর্থনীতিকে বোঝার জন্য ভালো উপায়।’

এদিকে শাটডাউন যত দীর্ঘস্থায়ী হোক না কেন, ফেড নিজেদের আওতায় থাকা প্রতিবেদনগুলো প্রকাশ করবে। কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি কাজ চালিয়ে নেয়ার জন্য সরকারি বাজেটের ওপর নির্ভর করে না। বন্ড ও অন্যান্য সিকিউরিটি থেকে অর্জিত আয়ের মাধ্যমে ফেড পরিচালিত হয়। ১৭ অক্টোবর মাসিক শিল্পোৎপাদন প্রতিবেদন প্রকাশ করবে ফেড। এতে খনি, উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতের তথ্য থাকে।

আরও